সদ্য প্রাপ্ত
দে‌শের প্রতি‌টি জেলা উপ‌জেলায় সংবাদকর্মী নি‌য়োগ দেওয়া হ‌বে। আগ্রহিরা যোগা‌যোগ করুনঃ ০১৯২০৫৩৩৩৩৯

আম্পানের একটি রাত(ছোট গল্প)
লেখিকা-তানহা ইসলাম,

সারাডাদিন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির লগে দমকা হাওয়া।হুনছি কি যেন এক ঘূর্ণিঝড় হইবে নাকি!পাশের বাড়ীর জলিল তো তাই কইল।টেলিভিসনে নাকি দেহাইছে।আম্পা না যেন কি নাম।এত কঠিন নাম!
বিছানা থেকে টুম্পা জিগ্যেস করলো;
আচ্ছা মা,ঘূর্ণিঝড়ের নাম এত কঠিন কেন হয়?ওরা শক্তিশালী তাই?
_হয়তো এইজন্যই।কি জানি বাপু।।তুই ভাত খেয়ে ঘুমাইয়া পড় মা।
_মা! এইবার ও কি আমগো ঘর বাড়ী উড়াইয়া নিব?
__ওইসব কতা কইতে নাই মা।কিচ্ছু হইবোনা।আয়,ভাত দেই।

রহিমা তার একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ভাত খেয়ে শুয়ে পড়লো।মা মেয়ের সংসার।স্বামী অনেক বছর আগেই মারা গেছে।টুম্পার বয়স তখন ২ মাস।সিডর নামক এক ঘুর্ণিঝড়ের রাতে বউ আর শিশু মেয়েকে বাঁচাতে যেয়ে রহিমার স্বামীর মৃত্যু।তারপর থেকে রহিমা খেয়া পাড়ে একটা ভাতের হোটেল চালিয়েই সংসার চালায়।ওদের বাড়িটাও নদী পাড়ে।মেয়েকে যাতে চোখে চোখে রাখতে পারে এজন্য নদীর পাড়েই ভাতের হোটেল দিয়েছিল রহিমা।
রাত ১০ টা হবে।বাতাসের বেগ বাড়তে চলেছে। রহিমা তার মেয়েকে শক্ত করে ধরে শুয়ে আছে।টিনের এক চালা ঘর।কাঠের বেড়া একটু পর পর নড়বড় করছে।বরিশালের ঘরগুলো সাধারণত এমনই হয়।

রহিমা একটু পর পর দোয়া পড়ছে।মেয়েকে কাঁথা দিয়ে ঢেকে রাখছে।রহিমার চিন্তা তার মেয়ের যেন ঘুম না ভাঙে।
নদীর উত্তাল শব্দ রহিমার কানে আসছে।নদীটি যেন আজ রেগে ফুলে ফেঁপে উঠেছে।রাগে গর্জন করছে।একটু পরেই রাগ ঝেড়ে ফেলবে।
রহিমা একটু পর শুনতে পেল তার রান্না ঘরের টিনের চালা উড়ে যাচ্ছে।মেয়েকে রেখে উঠবে তার ও সাহস ও পাচ্ছেনা।এবার জোরে জোরে দোয়া ইউনুস পাঠ করতে লাগলো।
বাতাস তার সব শক্তি দিয়ে রহিমার ঘরের টিনের চালা সরিয়ে নিচ্ছে মনে হচ্ছে।রহিমা এবার আতংকিত হয়ে উঠে বসলো।এবার ও যদি ঘর ভেঙে যায় তাহলে কিভাবে নতুন ঘর দিবে রহিমা সেই চিন্তা করতে লাগলো।
মা মা করে চিৎকার দিয়ে উঠলো রহিমার মেয়ে।
__মা,আমগো ঘর উইড়া যাইতেছে।চলো ধইরা রাখি।

রহিমা মেয়ের কথা শুনেই নিচে পা ফেলতেই তার পা ভিজে গেল।বুঝতে বাকি রইলো না ঘরে পানি উঠে গেছে।বালিশের পাশ থেকে ম্যাচ নিয়ে কুপি জ্বালানোর চেষ্টা করলো কিন্তু লাভ হলোনা।বাতাসের মাত্রা এত বেশি যে আগুনের সেখানে প্রবেশ নিষেধ।রহিমা তার মেয়েকে বিছানা থেকে নামতে না করলো।
রাত ১ টা হবে।বাতাসের মাত্রা আরো বেড়ে গেল।ঘরের মেঝেতে পানি বাড়ছে।নদীর এলোপাতাড়ি গর্জন মনে হচ্ছে কান দুটো তব্ধ করে দিবে।আধা মাইল দূরের নদীটা মনে হচ্ছে বাড়ীর উঠানে চলে এসেছে আর ঢেউ গুলো দরজার সাথে হুমড়ি খাচ্ছে।
হুট করে রহিমার ঘরের চালাটা উড়ে গেল।টুম্পাকে জরিয়ে ধরে জোরে জোরে আল্লাহর নাম নিতে লাগলো।’হে আল্লাহ!এইবারের মত বাঁচিয়ে দাও।।
মাথার উপর আকাশ টা যেন খুব কাছে মনে হচ্ছে।হালকা বৃষ্টির ফোঁটা।টুম্পা আকাশের দিকে হাত তুলে আল্লাহ কে ডাকছে আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
“আল্লাহ!তুমি বইন্যা থামাইয়া দাও।আল্লাহ! আমগো বাঁচাও।ওই বার নারগিস বইন্যায় ও আমগো ঘর ভাইঙ্গা গেছিল। এবার আর ভাইঙ্গোনা।
রহিমা কি করবে বুঝতে পারলোনা।পাশের বাড়ীতে যাবে এখন তার ও কোন উপায় নাই।
_কেন যে সাইক্লোন সেন্টারে গেলাম না।কেমনেই বা যাইতাম!ওই পাড়ার সবাই তো সব জায়গা দখল করে নিছে।
পানি প্রায় চকি ছুই ছুই।আরেকটু পর বিছানায় উঠে যাবে।রহিমা হঠ্যাৎ মনে পড়লো, উঠানে তার ছাগলের ঘর।দুইটা ছাগল তার।_ওদের কোন শব্দ পেলাম না।ওরা কই গেল! অবশ্য ছাগলের ঘর গুলো উচুঁতে,তাই হয়তো ওরা ঠিক আছে।এসব ভাবতেই রহিমা টুম্পাকে বলল;
___মা রে।তুই চকিতে দাঁড়াইয়া ঘরের খুটিডা ধইরা রাখ শক্ত কইরা।আমি একটু বাইরে দেইখা আই।
__না মা। তুমি যাবেনা।আমার ডর করতেছে।
___কিচ্ছু হইবোনা।আমি খালি দেইখা আমু।
___মা।বইন্যা কহন থামবে??
___এমনি থামবে।।আল্লাহ আছে না!সব ঠিক হইয়া যাইবো।

রহিমা চোখের জল মুছে মেয়েকে শান্তনা দিচ্ছে।।বাহিরে যাবে বলেও যেতে পারলোনা।বাতাস আর পানির মিলিত বেগে রহিমার ঘরের বাসন কোসন ভেসে যাচ্ছে।রহিমা একটা দুটো ধরতে হাত বাড়াচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর রহিমার ঘরের বেড়া টা ভেঙে পড়তেই রহিমা উঠে পড়লো সেটা বাঁচাতে।ধরতে পারলো বটে কিন্তু পানির স্রোতের কাছে হেরে গেল।বেড়ার সাথে রহিমা ভেসে গেল।সাতার কাটার প্রবল চেষ্টা রহিমাকে আরো দূর্বল করে ফেলল। টুম্পা তার মায়ের কথা না শুনতে পেয়ে চিৎকার করে উঠল।
___মা। কই তুমি? মা?ওমা!
ঝড়ের রাতে আকাশে আলো না থাকতেও কাছের কিছু দেখা গিয়েছিল।কিন্তু অন্ধকারে দূরের কিছু দেখা গেলনা।রহিমার মেয়ে চকিতে দাঁড়িয়ে খুঁটি ধরে মা মা করে চিৎকার করছে।বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। টুম্পা ভয়ে কেঁপে উঠছে।।
কিছুক্ষন পর বাতাসের রাগ পড়ে গেল।নদীর গর্জণ থেমে গেল।শুরু হলো প্রবল বর্ষণ। মুশলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।।ঝড়ের পড়ে বৃষ্টি খুবই পরিচিত।।
সকালের আলো হতেই সব কিছু স্বাভাবিক।প্রকৃতি যেন তার চেনা রূপে ফিরে এলো।শুধু তার প্রতিশোধের চিহ্ন গুলো পড়ে রইলো রাস্তার উপর।বিশাল বিশাল গাছ গুলো মাথা নিচু করে আছে।কেউ কেউ শরীর খানা লুটিয়ে দিয়েছে যেখানে সেখানে।কিছু ঘরবাড়ী তাদের পরিচয় হারিয়েছে।
স্থানীয় লোকেরা একে একে সবার খোঁজ নিতেই শেষমেষ রহিমার বাড়ী।।বাড়ী টা চেনা যাচ্ছেনা।ক্ষতবিক্ষত ভিটার উপর একটি চকি তার উপর অবশিষ্ট কাঠের ভাঙা বেড়া জড়োসড়ো হয়ে আছে।নদীর কিনারার বেশিরভাগ ঘর গুলোই নাই।তবে সবাই ঠিক আছে।ঝড় হবে জেনেই সবাই স্থানীয় সাইক্লোন সেন্টারে গিয়েছিল।
রহিমা আর তার মেয়েকে দেখতে না পেয়ে সবাই খোজাখুজি করলো।কাঠের বেড়াটা সরাতেই দেখতে পেলো টুম্পার মুখ খানি। দু হাতে একটা বাঁশের খুঁটি আঁকড়ে ধরে আছে।মুখটা সাদাটে হয়ে আছে।।

কৃতজ্ঞতায়- দৈনিক প্রভাত বার্তা

সংবাদটি প্রচার করুন




© All rights reserved © 2020 Daily Provat Barta
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com