সদ্য প্রাপ্ত
দে‌শের প্রতি‌টি জেলা উপ‌জেলায় সংবাদকর্মী নি‌য়োগ দেওয়া হ‌বে। আগ্রহিরা যোগা‌যোগ করুনঃ ০১৯২০৫৩৩৩৩৯
ফরাসি বিপ্লবের মহানায়ক, দার্শনিক রুসোর আজ জন্মবার্ষিকী

ফরাসি বিপ্লবের মহানায়ক, দার্শনিক রুসোর আজ জন্মবার্ষিকী

 

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রতিনিধিঃ

ফরাসি দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী এবং আলোকিত যুগের অন্যতম প্রবক্তা জঁ-জাক রুসোর আজ জন্মবার্ষিকী ।
অষ্টাদশ শতকের ফরাসি পুঁজিবাদী পথিকৃৎদের মধ্যে অন্যতম ব্যাক্তি ছিলেন। এসময় ফ্রান্সে একদল বিশ্বকোষিক সংঘবদ্ধভাবে সামন্তবাদ, কুসংস্কার ও প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে পুঁজিবাদ স্বাধীনতার চর্চা করেন।

রুসোর রাজনৈতিক চিন্তাধারা ফরাসি বিপ্লবকে যেমন প্রভাবিত করেছে, তেমনি পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদের বিকাশেও ভুমিকা রেখেছে। জন্মসূত্রে সুইজারল্যান্ডের অধিবাসী হলেও রুসো ছিলেন ফরাসি জ্ঞানালোক আন্দোলনের অন্যতম প্রতিনিধি এবং ইউরোপের প্রগতিবাদী ও গণতান্ত্রিক সমাজচেতনার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তিনি আত্মজৈবনিক রচনাশৈলীতে আধুনিক ধারার সূত্রপাত করেন এবং তার লেখনীতে মন্ময়ী চেতনার বিকাশের প্রভাব হেগেল ও ফ্রয়েডসহ অনুবর্তী অনেক চিন্তাবিদের মাঝেই সুস্পষ্ট। তার রচিত উপন্যাসগুলি ছিল একদিকে অষ্টাদশ শতকের জনপ্রিয় বেস্টসেলার এবং একই সাথে সাহিত্যে রোমান্টিকতাবাদের অন্যতম উৎস। তাত্ত্বিক ও সুরকার হিসাবে পাশ্চাত্য সঙ্গীতেও তার অসামান্য অবদান রয়েছে।

১৭১২ সালের ২৮শে জুনেজেনেভাপ্রবাসী প্রোটেস্ট্যান্ট মতানুসারী এক ফরাসি পরিবারে রুসোর জন্ম হয়। জন্মকালেই মাতৃহারা এবং দশ বছর বয়সে পিতা-পরিত্যক্ত রুসো আত্মীয়স্বজনের কাছে প্রতিপালিত হন। আত্মীয়রা পারিবারিক ঘড়ির ব্যাবসায় তাকে কাজে লাগাতে চাইলে ১৬ বছর বয়সে রুসো বাড়ি থেকে পালিয়ে যান এবং ভবঘুরের মতো বিভিন্ন স্থানে বিচিত্র পেশায় জীবিকা উপার্জন করেন। ১৭১৮ সালের দিকে মাদাম দ্য ওয়ারেনের সংস্পর্শে আসেন, পরবর্তীকালে যাঁর সাথে রুসোর প্রণয় সম্পর্কও গড়ে ওঠে। তিনি ভদ্রমহিলার অনুপ্রেরণায় ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত হন। নয়-দশ বছর তার কাছেই ছিলেন রুসো। তাদের মধ্যে একপর্যায়ে মনোমালিন্য হলে রুসো লিয়োঁ শহরে চলে যান ও সেখানে গৃহশিক্ষক হিসাবে কিছুদিন কাজ করেন। ১৭৪২ সালে প্যারিসে নিবাস গড়েন। প্রথম দিকে স্বরলিপি নকল করে উপার্জনের চেষ্টা করেন। এরপর মাদাম দুপাঁ নামের জনৈক অভিজাত মহিলার ব্যক্তিগত সহকারীর চাকুরী লাভ করলে আর্থিকভাবে খানিকটা সচ্ছল হন। প্রতিভাবান রুসো অল্পদিনের মধ্যেই মারিভো, দিদেরো, ফঁতনেল প্রমুখ নামককরা চিন্তাবিদের ঘনিষ্ঠতা অর্জনে সক্ষম হন। দিদেরো তার বিশ্বকোষে লেখার সুযোগ করে দিলে লেখালেখির প্রথম স্বীকৃতি পান।

১৭৪৯ সালে দিজোঁ অ্যাকাডেমি “বিজ্ঞান ও শিল্পকলার অগ্রগতি কি নৈতিকতাকে দূষিত করছে, না পবিত্র করেছে?” শীর্ষক প্রতিযোগিতামূলক রচনা আহবান করে। রুসো নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির পর তার নিবন্ধটি উপস্থাপন করেন। ১৭৫০ এ রচনাটিই প্রথম পুরস্কার জিতে নেয় এবং এরপর ভিন্ন মতাবলম্বী চিন্তাধারার লেখক হিসাবে রুসোর খ্যাতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

১৭৬২ সালে প্রকাশিত তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘দি সোস্যাল কন্ট্রাক্ট’ গ্রন্থে বলিষ্ঠ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা দেন। এই বইতে তিনি লিখেছেন ‘একমাত্র ন্যায়সঙ্গত শাসক হলো তারা, যাদের জনগণ স্বাধীনভাবে পছন্দ করে নেবে। রাজাকে শাসন করার ক্ষমতা জনগণই দেবে, কোনো ঈশ্বর নয়। একটা ভালো রাষ্ট্র একমাত্র গণতান্ত্রিক উপায়েই গঠন সম্ভব।’ এই ১৭৬২ সালে প্রকাশিত হয় উপন্যাস’ ‘এমিলি’ এবং ধর্মযাজকদের সমালোচনা করে লেখা ‘বিশ্বাসীদের পেশা’। এর ফলে রোমান ক্যাথলিকদের বিরাগভাজন হন তিনি। ধর্মীয় অনুভূমিতে আঘাত দেয়ার জন্য তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। । এ সময় তিনি পালিয়ে সুইজারল্যান্ডে চলে আসেন। তার বিপ্লবী চিন্তাধারা ও ধর্মীয় ধ্যান-ধারণার বিরোধিতার কারণে সুইজারল্যান্ডের জনগণও তাকে পছন্দ করত না। এখানেও তার জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। পরে ইংল্যান্ড চলে যান। বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক ডেভিড হিউস তাকে পূর্ণ নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে স্বাগত জানান।

রুসোর মতে, প্রকৃতি মানুষকে যেভাবে ও যে উদ্দেশ্যে গড়ে, সমাজের দোষে তা ব্যর্থ হয়ে যায়। ললিতকলা ও বিজ্ঞানের বেদীমূলে সৃষ্ট সভ্যতার উপর তার কোন আস্থা ছিল না। মানব উৎকর্ষর সাথে শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের বিকাশ সম্পর্কিত রেনেসাঁস ও আলোকময়তা মতবাদের সাথে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করে রুসো বলেন:

“সমাজ ও সমাজের বিলাসিতা থেকেই জন্ম নেয় মানববিদ্যা, প্রযুক্তি, ব্যবসাবাণিজ্য, পাণ্ডিত্য এবং সেই সব বাহুল্য যা শিল্পের বিকাশ ঘটায় কিন্তু একই সাথে সমাজকে সমৃদ্ধ ও ধ্বংস করে। বিখ্যাত জাতিসমূহের প্রাচুর্য তাদেরকে যে ক্লেদাক্ত দুঃখ-দুর্দশার দিকে ঠেলে দেয় এই হচ্ছে তার কারণ। একদিকে শিল্প ও মানববিদ্যা যতই উন্নতি লাভ করে, অন্যদিকে করের বোঝায় জর্জরিত শ্রমে-ক্ষুধায় কাতর অনাদৃত কৃষক ততই রুজির সন্ধানে শহরমুখী হয়। আমাদের নগরগুলি যতই দৃষ্টিনন্দন হয় ততই গ্রামাঞ্চল বিরান হতে থাকে। অনাবাদী জমির পরিমাণ বাড়ে। নাগরিক হয় ভিখারি বা ডাকাত, আর ওদের জীবনের ইতি হয় ফাঁসির মঞ্চে বা আবর্জনাস্তুপে। এভাবে রাষ্ট্র একদিকে ফুলেফেঁপে ধনী হয়, অন্যদিকে হয় জনশূন্য বিরান। প্রবল প্রতাপ, সাম্রাজ্য এভাবে অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে তোলে সমৃদ্ধির সৌধ আর ডেকে আনে জনজীবনে অবলুপ্তি।”

রুসোর মতবাদ হল প্রকৃতি সাম্য ধারণার উপর নির্ভরশীল, যেখানে মানুষ মাত্রই সমান, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং তৃপ্ত। প্রকৃতির সেই সুখী ও সৎ মানুষকে সমাজ ব্যবস্থা দুর্নীতিপ্রবণ ও দুর্দশাগ্রস্ত করেছে। রুসো সেই সমাজ ব্যবস্থার একাধারে সমালোচক এবং সমাধানে প্রয়াসী। সমাধান হবে ব্যক্তি ও সমাজের যৌথ পরিবর্তনের দ্বারা। ব্যক্তির উদ্ধার হবে শিক্ষায়, যার বিবরণী আছে এমিল বইটিতে। আর সমাজের উদ্ধারসাধন সম্ভব যদি মানুষ সমাজবন্ধনের গোড়ার কথা মনে রাখে। যার আলোচনা আছে সামাজিক চুক্তি গ্রন্থে। ব্যক্তি তার নিজস্ব স্বাধীনতা খানিকটা বিসর্জন দেয় রাষ্ট্র-সমাজ গঠনে, কিন্তু সে কারো গোলাম নয়। রুসোর মতে, মানবিক জ্ঞানের উন্নতি এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভবের ফলে শ্রমের শ্রেণীবিভক্তি সূচিত হয় এবং মানবজাতির প্রাকৃতিক সুখকর অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে ধনী-দরিদ্র বিভাজন সৃষ্টি করে, যার পরিণতিতে রাষ্ট্রীয় সমাজ অত্যাবশ্যক হয়ে যায়। এ সমাজ সংগঠন তথা রাষ্ট্র মানুষের কৃত্রিম জীবনের ফল।

রুশোকে ফরাসি বিপ্লবের মূল কারিগর মনে করা হয়। তিনি তার লেখনির মাধ্যমে ফরাসি বিপ্লবের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জাগ্রত করতে সক্ষম হন।তিনিই প্রথম উল্লেখ করেন,”মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন, কিন্তু সমাজ তাকে শৃংখলিত করে।
তিনি উল্লেখ করেন পূর্বে মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে স্বাধীন ছিল। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানার ধারণা সৃষ্টি হলে সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি হয়।এর ফলে প্রতারণা ও অপৃপ্ত বাসনা মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে।তাই মানুষ ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে সামষ্টিক ইচ্ছার কাছে সর্মপন করে।এভাবেই রাষ্টের সৃষ্টি।তাই জনতার অধিকার রয়েছে বিপ্লবের দ্বারা রাজতন্ত্রের পতন ঘটাবার। “লা কস্তা সোসিয়াল” গ্রন্থে উল্লেখিত এ বাণী ফরাসি জনগণকে বিপ্লবে অনুপ্রাণীত করে।তাই রুশোকে ফরাসি বিপ্লবের মূল প্রবক্তা বলা হয়।

১৭৭০ সালে রুসো প্যারিসে ফেরত আসেন এবং আবার স্বরলিপি রচনায় আত্মনিবেশ করেন। তার স্বরলিপির প্রণালী ছিল স্বউদ্ভাবিত, ব্যাতিক্রমী ধরনের। তিনি লেখা শুরু করেন বিখ্যাত আত্মজীবনী। জীবনের শেষদিকে সন্দেহপ্রবণতা মানসিক বিকারের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। সকলেই তাকে অপমানিত ও হেয় প্রতিপন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এ ধারণা ক্রমেই রুসোর মাঝে বদ্ধমূল হতে থাকে এবং বন্ধুপ্রতিম দিদেরো, হিউম, গ্রিম প্রমুখ সকলকেই শত্রু ভাবতে শুরু করেন। ১৭৭৮ সালের ২রা জুলাই ভাগ্যবিড়ম্বিত এ চিন্তানায়কের জীবনাসান ঘটে।

সংবাদটি প্রচার করুন




© All rights reserved © 2020 Daily Provat Barta
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com