সদ্য প্রাপ্ত
দে‌শের প্রতি‌টি জেলা উপ‌জেলায় সংবাদকর্মী নি‌য়োগ দেওয়া হ‌বে। আগ্রহিরা যোগা‌যোগ করুনঃ ০১৯২০৫৩৩৩৩৯
ফাঁসির মঞ্চে হেসেছিলেন ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু

ফাঁসির মঞ্চে হেসেছিলেন ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু

স্টাফ রিপোর্টার,

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ১৮ বছরের তরুন ভারতীয় বাঙ্গালি যুবক প্রাননাশের সম্ভাবনাকে তুচ্ছ করে দুঃসাধ্য কাজ করার যে ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন তা ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দ্বিতীয় কাউকে আর দেখা যায় না। বলছি বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর কথা। তাঁর স্বভাবে নেশার মতো অত্যন্ত প্রবল ছিল সৎসাহস। আর তাঁর ছিল অন্যায় অত্যাচারের তীব্র অনুভূতি। সেই অনুভূতির পরিণতি বক্তৃতায় ছিলনা, বৃথা আস্ফালনও ছিলনা; অসহ্য দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ, এমনকি মৃত্যুকে বরণ করে, প্রতিকার অসম্ভব জেনেও শুধু সেই অনুভূতির জ্বালা নিবারণের জন্য, নিজ হাতে অন্যায়ের প্রতিবিধানের উদ্দেশ্যে প্রতিবিধানের চেষ্টা করবার ঐকান্তিক প্রবৃত্তি ও সৎসাহস ক্ষুদিরাম চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৩ ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত মেদিনীপুর শহরের কাছাকাছি (বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা) কেশপুর থানার অন্তর্গত মৌবনী (হাবিবপুর) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা লক্ষ্মীপ্রিয় দেবী ও পিতা ত্রৈলোক্যনাথ বসু ছিলেন নাড়াজোলের তহসিলদার।

ক্ষুদিরামের বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর তখন তিনি তাঁর মাকে হারান। এক বছর পর তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। তখন তাঁর বড়ো দিদি অপরূপা তাকে দাসপুর থানার এক গ্রামে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। অপরূপার স্বামী অমৃতলাল রায় ক্ষুদিরামকে তমলুকের হ্যামিল্টন হাই স্কুলে ভর্তি করে দেন।

১৯০৩ সালে কিশোর ক্ষুদিরাম স্বাধীনতার জন্যে জনসমক্ষে ধারাবাহিক বক্তব্য এবং বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে গোপন অধিবেশনে সক্রিয়ভাবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে স্পষ্টভাবেই তিনি অনুশীলন সমিতিতে যোগদান করেন এবং কলকাতায় বারীন্দ্র কুমার ঘোষের কর্মতৎপরতার সংস্পর্শে আসেন।

ক্ষুদিরাম মাত্র ১৫ বছর বয়সেই অনুশীলন সমিতির একজন স্বেচ্ছাসেবী হয়ে ওঠেন এবং ভারতে ব্রিটিশ শাসন বিরোধী পুস্তিকা বিতরণের অপরাধে গ্রেপ্তার হন। ১৬ বছর বয়সে ক্ষুদিরাম থানার কাছে বোমা মজুত করতে থাকেন এবং সরকারি আধিকারিকদেরকে আক্রমণের লক্ষ্য স্থির করেন।

১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ক্ষুদিরাম তার বোন অপরূপার স্বামী অমৃতলাল রায়ের সঙ্গে তমলুক শহর থেকে মেদিনীপুরে চলে আসেন। এখানে এসে মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন।
মেদিনীপুরে তার বিপ্লবী জীবনের অভিষেক। তিনি বিপ্লবীদের একটি নবগঠিত আখড়ায় যোগ দেন। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু এবং রাজনারায়ণ বসুর প্রভাবে মেদিনীপুরে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন গড়ে উঠেছিল। সেই সংগঠনের নেতা ছিলেন হেমচন্দ্র দাস কানুনগো এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন হেমচন্দ্র দাসের সহকারী। এটি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্রিটিশবিরোধীদের দ্বারা পরিচালিত হতো। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই ক্ষুদিরাম তার গুণাবলীর জন্য সবার চোখে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন। ক্ষুদিরাম সত্যেন্দ্রনাথের সাহায্যে বিপ্লবী দলভুক্ত হয়ে এখানে আশ্রয় পান। ক্ষুদিরাম তারই নির্দেশে ‘সোনার বাংলা’ শীর্ষক বিপ্লবাত্মক ইশতেহার বিলি করে গ্রেপ্তার হন।

১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে কাঁসাই নদীর বন্যার সময়ে রণপার সাহায্যে ত্রাণকাজ চালান। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে বারীন্দ্র কুমার ঘোষ তার সহযোগী হেমচন্দ্র কানুনগোকে প্যারিসে নির্বাসনে থাকা একজন রাশিয়ান নিকোলাস সাফ্রানস্কি-এর কাছ থেকে বোমা তৈরির কায়দা শেখার জন্যে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। প্রদেশ ফেরার পর হেমচন্দ্র এবং বারীন্দ্র কুমার আবার দুজনের সহযোগিতায় ডগলাস কিংসফোর্ডকে তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেন। কিংসফোর্ড আলিপুর প্রেসিডেন্সি বিচারালয়ের মুখ্য হাকিম ছিলেন, যার হাতে ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত এবং যুগান্তর এর অন্যান্য সম্পাদকদের মামলা চলছিল।

হেমচন্দ্রের তৈরি করা বই বোমা দিয়ে কিংসফোর্ডকে গুপ্তহত্যার প্রথম প্রচেষ্টা করা হয়। বাদামি কাগজ দিয়ে মুড়ে নবীন বিপ্লবী পরেশ মল্লিক কিংসফোর্ডের বাড়িতে দিয়ে আসেন। কিন্তু কিংসফোর্ড প্যাকেটটা না-খুলে পরে দেখবেন বলে তার সেলফে রেখে দেন। দুর্ভাগ্যবশত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় মুজাফফরপুরে কিংসফোর্ডকে গুপ্তহত্যার দ্বিতীয় প্রচেষ্টা করেন ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল। তবে ভূল করে কিংসফোর্ড ও তার স্ত্রীকে ভেবে কিংসফোর্ডের বাড়ির সামনের চত্তরে গাড়িতে প্রিঙ্গল কেনেডি নামে একজন ব্রিটিশ ব্যারিস্টারের মেয়ে এবং স্ত্রীর বোমা ছোড়েন ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল। এতে করে মিস কেনেডি ও মিসেস কেনেডি মারা যান।

ঘটনাস্থল থেকে তারা পলায়ন করলেও পরবর্তীতে মুজাফফরপুর থেকে পুলিশ ক্ষুদিরামকে আটক করেন। অন্যদিকে প্রফুল্ল পুলিশের হাতে ধরা না দিয়ে নিজের রিভলবারের অবশিষ্ট একটি গুলি দিয়ে আত্নহত্যা করেন।

১ মে, ১৯০৮ হাতে হাতকড়ি লাগানো ক্ষুদিরামকে যখন মুজফফরপুর থেকে আনা হয় তখন পুরো শহর থানায় ভিড় করেছিল একদল সশস্ত্র পুলিশকর্মীর ঘিরে থাকা একটা কিশোর ছেলেকে শুধু একপলক দেখার জন্যে। পরের দিন, অর্থাৎ ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ২ মে, ইংরেজি দৈনিক দ্য স্টেটসম্যান লিখেছিল:

“একটা ছেলেকে দেখার জন্যে রেল স্টেশনে ভিড় জমে যায়। ১৮ অথবা ১৯ বছরের এক কিশোর হলেও তাঁকে রীতিমতো দৃঢ় দেখাচ্ছিল। বাইরে তার জন্যেই রাখা এক চারচাকার খোলা গাড়িতে উঠতে প্রথম শ্রেণীর এক রেল কামরা থেকে বেরিয়ে সে হেঁটে আসছিল, এক উৎফুল্ল কিশোরের মতো, যে কোনো উদ্বেগ জানেনা….গাড়িতে নির্দিষ্ট আসনে বসার সময় ছেলেটা চিৎকার করে বলে উঠল ‘বন্দেমাতরম্’।”

৩০ এপ্রিল, ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে মুজাফফরপুর, বিহারে রাতে সাড়ে আটটায় ইওরোপিয়ান ক্লাবের সামনে বোমা ছুড়ে তিনজনকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ক্ষুদিরামের বিচার শুরু হয় ২১ মে ১৯০৮ তারিখে যা আলিপুর বোমা মামলা নামে পরিচিত হয়। বিচারক ছিলেন জনৈক ব্রিটিশ মি. কর্নডফ এবং দুজন ভারতীয়, লাথুনিপ্রসাদ ও জানকীপ্রসাদ। রায় শোনার পরে ক্ষুদিরামের মুখে হাসি দেখা যায়। তার বয়স খুব কম ছিল। বিচারক কর্নডফ তাকে প্রশ্ন করেন, তাকে যে ফাঁসিতে মরতে হবে সেটা সে বুঝেছে কিনা? ক্ষুদিরাম আবার মুচকে হাসলে বিচারক আবার প্রশ্নটি করেন। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ভোর ছ-টায়। ফাসির মঞ্চ ওঠার সময়ে তিনি হাসিখুশি ছিলেন।

সংবাদটি প্রচার করুন




© All rights reserved © 2020 Daily Provat Barta
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com